৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণ

Home/৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণ

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণ

আজ দুংখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি, আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন, আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করছি, কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।

আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়, কি অন্যায় করেছিলাম?

১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খাঁন মার্শাল-ল জারী করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে।

১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলনের সময় আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আইয়ুব খাঁনের পতনের পর ইয়াহিয়া এলেন। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল। নির্বাচন হলো। আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দিতে। তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।

আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেয়া হলো। দেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম, আপনারা শান্তিপূর্নভাবে হরতাল পালন করুন, কল কারখানা সব বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। আমরা জামা কেনার পয়সা দিয়ে অস্ত্র পেয়েছি বহিঃ শত্রুর আক্রমন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র আমার দেশের গরীব-দুংখী মানুষের বিরুদ্ধে-তার বুকের উপর হচ্ছে গুলী।

২৫ তারিখে এসেম্বলি ডেকেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ১০ তারিখে বলেছি, রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের উপর পাড়া দিয়ে, এসেম্বলি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শাল-ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকের ভিতর ঢুকতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে তাদের তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কি পারবনা। এর পূর্বে এসেম্বলিতে আমরা বসতে পারিনা।

আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা। আমি এই দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশের কোর্ট- কাচারি, আদালত- ফৌজদারি, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ঠকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য যেসমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলি আছে , সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিক্সা, গরুর গাড়ী, রেল চলবে – শুধু সেক্রেটারিয়েট , সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তর , ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারিরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, এরপর যদি ১ টি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়; তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তা ঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। সৈন্যরা তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করোনা। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।

এই দেশের মানুষকে খতম করবার চেষ্টা চলছে – বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্ল্যায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন এবং আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়েই প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো তবুও এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে তুলবো ইনশাল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা।

 

২৪হেল্পলাইন.কম/এপ্রিল,২০১৮/বাঙালী

By | 2018-10-18T07:01:40+00:00 April 18th, 2018|Comments Off on ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণ