রোহিঙ্গা জীবনের গল্প-সীমান্তের ওপারে

Home/রোহিঙ্গা জীবনের গল্প-সীমান্তের ওপারে
See this post 19 views

রোহিঙ্গা জীবনের গল্প-সীমান্তের ওপারে

(রোহিঙ্গা জীবনের গল্প-সীমান্তের ওপারেঃ পর্ব-০৩)

মংডু ॥ রাখাইন রাজ্য ॥ মিয়ানমার

শরতের বিকাল, নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা। পাহাড়ের উপর দিয়ে আকাশের বুকে শ্বেত বলাকার মতো যখন শুভ্র মেঘ ভেসে যায়- নির্নিমেষ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সাদ। একপাশে দিগন্ত জোড়া খোলা ধান ক্ষেত, অন্য পাশে পাহাড়ের উপর দিয়ে মেঘ পেজা তুলার মতো উড়ে যায়। মেঘের আকৃতি বদল হতে থাকে ক্ষণে ক্ষণে। শরতের মেঘ বিভিন্ন আকার ধারণ করতে পারে। কখনো হাতি, ঘোড়া, নানাবিধ জীবজন্তু এবং বিভিন্ন আকৃতি। এগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে ওর। বর্ষাকালের মতো এখন আর অত ক্ষেতের কাজ নেই। এরপর হেমন্ত আসবে, ধান ফলবে। তারপর ধীরে ধীরে পাকা ধানে সোনালি বর্ণ ধারণ করবে। কৃষক ধান কেটে ঘরে ফিরবে। সারা বছরের খাদ্য সঞ্চয় করে রেখে যে যার কাজে মনোযোগ দিবে। এইসব সাত-পাঁচ ভাবছে সাদ; এমন সময় পিছন থেকে গামছা দিয়ে ওর চোখ বেঁধে ফেললো কেউ। আচমকা চোখ বেঁধে ফেলায় ভয় পেয়ে গেল ও। চিৎকার করে বললো- কে রে? ও হাত ধরার চেষ্টা করলো। কিন্তু আক্রমণকারীও বেশ চালাক, সে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে রেখে হাতটা দূরে সরিয়ে রেখেছে যেন সাদ ধরতে না পারে। কোনো কথা বলছে না দেখে সাদ ভাবলো নিজেদের কেউ হবে। জোর করে গামছা হতে চোখ মুক্ত করে তাকিয়ে দেখে গোল চেহের।

সাদের অভিব্যক্তিতে রাগ ফুঠে উঠতে দেখে বললো- আরে আরে রাগছ কেন? আমি তো একটু দুষ্টামি করছিলাম।
আর কখনো এমন করবে না।
কিন্তু কেন? কি হয়েছে! এত রাগছ কেন?
হঠাৎ করে এই রকম করলে তো রাগ হবেই।
ভয় পেয়েছিলে নাকি? এত রাগছ যে?
পাছে গোল চেহের আবার দুর্বলতা বুঝে ফেলে তাই তাড়াতাড়ি ও বললো- আরে না। কি যে বলো।
আচ্ছা ওসব কথা থাক, বলো একা একা বসে ভাবুকের মতো কি ভাবছো?
কি আর ভাববো! ভাবছি জীবনের কথা, ভবিষ্যতের কথা।
সেটা আবার কি?

ভাবছি কি করবো জীবনে? সারাজীবন কি ক্ষেতে কাজ করবো আর গরু-মহিষ পালন করবো? বিধাতা আমাদের কি জন্য সৃষ্টি করেছেন? জীবনের উদ্দেশ্য কী?
লেখাপড়া তো শিখতে পারিনি, গ্রামে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। মধ্যবর্তীর গন্ডিও পার হতে পারিনি। শুধু প্রাইমারি শেষ করেছি। তারপর আর এগোতে পারিনি। লেখাপড়া ছাড়া কি জীবনে ভাল কিছু হবে?
কেন হবে না? অন্য সবাই করছে না?
অন্য সবাই ভালো কি করছে?
কেন জমিতে ধান লাগাচ্ছে, কৃষি কাজ করছে। কেউ ব্যবসা করছে। মাছ ধরছে। কারো কারো শহরে ভালো দোকানপাটও আছে। বেশ আয় হয়, ভালোই তো চলে।
এগুলোকে তুমি ভালো বলছো? আজ পর্যন্ত আমি মংডু শহরে যাইনি, যাইনি বুথিডং, সিত্তে কোথাও কোনো টাউনশীপে!
যাওনি তো কি হয়েছে? যাবে।
তুমি বুঝতে পারছ না আমি কি বোঝাতে চাচ্ছি। আমি বলতে চাচ্ছি- রাখাইনের যে কোনো জায়গায় আমি যেতে পারবো না। রাখাইনের বাইরে অন্য কোথাও যেতে পারবো না, লেখাপড়া শিখতে পারলাম না; জীবনে কোনোদিন মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে যাওয়া হবে না। কেন? আমরা কি এদেশের মানুষ না? এই জল হাওয়া প্রকৃতির বুকে কি আমি জন্ম নেইনি? আমার বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষ বসবাস করছে এখানে আর আমার কোনো অধিকার নেই, এটা কি কিছু হলো? আর তুমি বলছো অন্য সবার মতো আমিও কৃষিকাজ করে, কোনো একটা কিছু করে জীবন পার করে দেই। মানুষের জীবন তো একটা। জন্মালাম এই চির সুন্দর পাহাড়ের পাদদেশে, সীমাহীন সবুজের বুকে; কিন্তু আর কোথাও যেতে পারলাম না, পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সৌন্দর্য কিছুই দেখতে পারলাম না। উচ্চ শিক্ষিত হতে পারলাম না। আবার কোনো একদিন চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নায় অথবা ঘোর অমাবস্যার রাতে মরে গেলাম চির জীবনের মতো। কি লাভ হবে তাতে? দু’চারটা ছেলে-মেয়ে, বৌ রেখে গেলাম হয়তো। এই কী জীবন? এই কি বেঁচে থাকা? এই জন্যই কি পৃথিবীতে এত কষ্ট করে বেঁচে থাকা? একটা জীবন কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে?
বলতে বলতে বাস্পরুদ্ধ হয়ে আসে সাদের চোখ। গোল চেহের তাই দেখে তাড়াতাড়ি বললো- আসলে তোমার মতো করে আমি কোনোদিন ভাবিনি। তুমি আসলে অনেক বড় কথা বলে ফেলেছ। আমাকে ভাবতে দাও। আমি তোমার কথা সবটুকু বুঝতে পারছি না।
তুমি সব বুঝবেও না।না আমি যতটুকু বুঝি। আমাদের অনেক সমস্যা আছে, বিধি-নিষেধ আছে, তারপরও তো জীবন চলে যাচ্ছে।
জীবন তো চলে যাবেই। চিরদিন আমাদের উপর অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণ করে ওরা গড়ছে সম্পদের পাহাড়। আর আমরা বঞ্চিত হচ্ছি মৌলিক অধিকারটুকু থেকে। সেই ১৯৮২ সাল থেকে আমাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের চলাচল সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা পড়ালেখা করতে পারছি না ফলে উন্নতি করা আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়। আজ যদি কারো গুরুতর অসুখ হয় সে বিনা চিকিৎসায় অথবা সামান্য চিকিৎসায় মারা যাবে। গ্রামে কোনো হাসপাতাল নেই, যা একটা আছে তাও ২০ কিলোমিটার দূরে- আমাদের কি এই সামান্য অধিকারটুকুও নেই?
তুমি যা বলছো সবই ঠিক আছে; কিন্তু আমরা কি করতে পারি?
এখানেই তো আমাদের অসহায়ত্ব। সবই বুঝতে পারছি কিন্তু কিছুই করতে পারছি না।
এভাবে কথায় কথায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। গোল চেহের উঠে বাড়িতে চলে যায়। কিন্তু সাদ বসে থাকে একাকী, এখানে ও প্রায়ই বসে থাকে। ওদের বাড়ির খুবই কাছে এই নদী। ওদের আর গোল চেহেরদের বাড়ি দু’টি পাশাপাশি আর বহুদূর পর্যন্ত কোনো বাড়িঘর নেই। এখানে রাস্তার নিচে সমতল ভূমিতে ওদের দোতলা কাঠের বাড়ি প্রায় পাঁচ বিঘা জমির উপরে। চারদিকে নারিকেল, সুপারি, পরীরাজ আর কলাগাছ এবং বিভিন্ন ফলের গাছ দিয়ে সাজানো একটি বাগানের মতো। একপাশে বাঁশঝাড়ও আছে। পিছন দিয়ে ছোট্ট নদী চলে গেছে এঁকেবেঁকে। তার এক কিলোমিটার পরে পাহাড়। সাদ মাঝে মাঝে অন্ধকার রাতে এখানে বসে থাকে। উপর হতে নক্ষত্রেরা আলো দেয়। মিটমিট করে জ্বলে আকাশের বুকে, অসংখ্য তারার মেলা বসে। ছায়াপথের অসংখ্য তারার মেলার মাঝে উত্তর- দক্ষিণের সরু পথটা দেখে ও। সন্ধ্যার আকাশে সন্ধ্যাতারা জ্বলজ্বল করে জ্বলে। বাঁশবনের পাশের ঘন ঝোপে আর বাগানের ভিতরের জোনাকিরা জ্বলে ওঠে বিয়েবাড়ির ছোট্ট নীল লাইটের মতো।

কিন্তু আজ পূর্ণিমা। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ সবে উঁকি দিয়েছে পূর্ব দিগন্তের পাহাড়ের মাথার উপর। মোহনীয় জ্যোৎস্নার আলোয় ভরে যাচ্ছে পাহাড়ের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি রাস্তা, গাছপালা; জ্যোৎস্নার প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে অবারিত দিগন্ত। সাদের মন খুবই অস্থির, আনমনা আজ।

প্রতিদিনের মতো কোমরে গুঁজে রাখা বাঁশি বের করে সুর তোলে ও। সাদ চমৎকার বাঁশি বাজাতে পারে। ও যখন বাঁশি বাজায় গ্রামের প্রতিটি মানুষ ওর বাঁশির সুর শুনে মুগ্ধ হয়। আকাশ বাতাস মুখরিত করে সাদ ওর বাঁশিতে তোলে করুণ সুর, বিরহী সুর, যে সুর ওর জীবনকে করে তুলছে আন্দোলিত। জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না মেলার সুর। বাতাসে ওর বাঁশির সুর ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় আর সুপারীর শাখায় দোল খাওয়া বাতাসে। 

সাদ যেদিন এমন করে বাঁশিতে সুর তোলে সেদিন আর ঘরে থাকা হয় না গোল চেহেরের। ঘরের ভিতর বাঁশির সুর শুনে অস্থির হয়ে যায় ও। ছুটে চলে আসে সাদের কাছে। কিন্তু এখন ও বড় হয়েছে, রাত-বিরাতে বাইরে বের হতে চাইলেও বের হতে পারে না বড়দের দৃষ্টির কারণে। আজ অবশ্য কারণ পেয়ে গেল। ওর মা খুব সুন্দর করে কয়েক রকমের স্পেশাল পিঠা বানিয়েছেন। এর মধ্যে ওর পছন্দের বলা পিঠা, জালা পিঠা, গুড় পিঠা, লুরি পিঠা ও গোলালী পিঠা। গোল চেহের একটা গামলায় করে পিঠা নিয়ে সাদদের বাড়িতে দেওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়ে। ওদের বাড়িতে কিছু দিয়ে কিছু পিঠা নিয়ে ও সাদের কাছে চলে আসে। পিছন থেকে কাঁধের উপরে হাত রাখে গোল চেহের।
ঘাড় ফিরিয়ে চাঁদের আলোয় গোল চেহেরকে দেখে বুকের মধ্যে রক্ত ঝলকে ওঠে ওর। এত রাতে গোল চেহের তার কাছে! হায় হায়! কেউ যদি কিছু ভাবে?
সাদ বললো- তুমি এত রাতে?
কেন রাতে বুঝি তোমার কাছে আসতে নেই?
না তা নয়- আমতা আমতা করে বললো সাদ। আসলে তুমি বড় হচ্ছো তো। লোকে দেখলে কি ভাববে?
যা ভাবে ভাবুক। আমি তো ছেলেবেলা থেকে তোমার ছায়া হয়ে আছি, আর এখন একটু বড় হয়ে গেছি দেখে সমস্যা?
মেয়েদের বড় হয়ে গেলে একটু বুঝে-শুনে চলতে হয়।
তাই বলে তোমার কাছে আসতে পারবো না?
না না তা নয়। তবে তুমি রাতে এসো না, মানুষ মন্দ কথা বলবে। তুমি বুঝতে পারছ না?
তা হলে তুমি রাতে বাঁশি বাজাবে না, তবে আর আসবো না। তুমি বাঁশি বাজালে আর ঘরে থাকতে পারি না।শুধু মনে হয় তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। তোমার বাঁশির করুণ সুর শুনে আমার অনেক মায়া লাগে তোমার জন্য।
এটা কি শুধুই মায়া! অন্য কিছু নয়তো?
তাতো জানি না।
আচ্ছা তুমি কি এনেছ? তোমার হাতে ওগুলো কি?

তোমার জন্য পিঠা নিয়ে এসেছি, এতে তোমার প্রিয় পিঠা আছে; বলতো কি পিঠা?
গোলালী পিঠা।
একদম ঠিক। তোমার পছন্দের পিঠার নাম তুমি জানবে না তা কি হয়? আর আমি তো জানিই।
তা তো ঠিকই আছে, কিন্তু এই রাতে নদীর ধারে পিঠা নিয়ে হাজির। যদি ভূতে ধরে? তোমার ভয় করে না। তারপর আবার বাড়ি থেকে বাইরে পিঠা এনেছ?
আরে ওসব কুসংস্কার বাদ দাওতো।
সবাই বলে পিঠার পিছন পিছন নাকি ভূত আসে। তোমার ভয় করে না?
তুমি থাকতে ভয় কিসের? এই নাও। সাদ পিঠা খেল, সাথে গোল চেহেরও।
পৃথিবী বড় বিচিত্র। কেউ খাইয়ে আনন্দ পায় আর কেউ খেয়ে।
তুমি কি এমনি করে সারাজীবন আমাকে পিঠা খাওয়াতে চাও।
যদি তুমি চাও, তাহলেই।
আমি তো অবশ্যই চাই।
তাহলে তো কথাই নেই। আমি চাই তুমি সারাজীবন আমার পাশেই থাকো। যেমন আছ ছোট্টবেলা থেকে ক্ষেতে, খেলার মাঠে, নদীর তীরে, বাড়িতে- সর্বত্র। কি রাজি?
আচ্ছা, বলেই সাদের হাতের থালা কেড়ে নিয়ে গোল চেহের বাড়ির দিকে ছুটে যায় লজ্জা পেয়ে।

সাদ বসে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। বসে বসে চাঁদের সৌন্দর্য দেখে আর ভাবে আজ গোল চেহেরকে ও কি বললো! সে কি আসলে ওকে ভালোবাসে? ওকে পেতে চায়। বাল্যকাল কৈশোর ছাড়িয়ে গোল চেহের আজ যৌবনে পদার্পণ করেছে। এতদিনের পাশাপাশি চলার অনুভূতি আজ রূপান্তরিত হচ্ছে সূক্ষè ভালো লাগায়, তারপর হয়তো একদিন ভালোবাসায়। আসলে গোল চেহের ওর জীবনের প্রতিটি পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে আছে জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, শিরায়-উপশিরায়। আজকে যে ভালো লাগার আবেশ ছাড়িয়ে দিয়ে গেল ও, এর আগে কোনোদিন এমন করে অনুভব করেনি সাদ। প্রথম ভালোবাসা বুঝি এমন করেই আসে, হৃদয়ের গভীরে শিরশিরে অনুভূতি জাগিয়ে আসে। চাঁদনি রাতের ঈষৎ পেলবিত জ্যোৎস্নার পাখায় ভর করে আসে। নিঃসঙ্গ শর্বরীর কোলে নির্জনতার বুক চিরে শুভ্র চাঁদের আলোয় দূর আকাশের নক্ষত্রের ডানায় ভেসে ভেসে হৃদয়ের অলিন্দে আসে।চোখ রাখুন “রোহিঙ্গা জীবনের গল্প-সীমান্তের ওপারেঃ ৪র্থ পর্বে”।

২৪হেল্পলাইন.কম/মে ,২০১৮/মোঃ সিরাজুল ইসলাম-এফসিএ

By | 2018-10-18T06:56:30+00:00 May 12th, 2018|Comments Off on রোহিঙ্গা জীবনের গল্প-সীমান্তের ওপারে