দি পাওয়ার অব ‘ওয়াও’! (The Power of ‘Wow’!)

Home/দি পাওয়ার অব ‘ওয়াও’! (The Power of ‘Wow’!)

দি পাওয়ার অব ‘ওয়াও’! (The Power of ‘Wow’!)

কখনো ঠোট চেপে ওয়াও (wow) বলার চেষ্টা করে দেখেছেন? চেষ্টা করলেও লাভ নেই, কারন ওয়াও শব্দটাই এমন, যা অবাক বিস্ময় নিয়ে আপনার আমার অজান্তেই কোন কিছুতে চোখ আটকে গেলে, মুখটা হা করতেই অনুভুতির বহিঃপ্রকাশ হয়ে যায়। মনে করে দেখুনতো, ঠিক কবে শেষবারের মতন সে ওয়াও অনুভুতির দেখা পেয়েছেন। কি মনে পড়ছেনাতো? তার মানে বড়দের চরম ব্যস্ততায় ভরা জীবনে এমন অনুভুতির সাথে সচরাচর সাক্ষাৎ পাওয়ায় ভারী দায়। তবে যাই বলেন, আমাদের ছোটকালে এরকম ঘটনা হরহামেশায় ঘটেছে। অন্ততঃ বড় বেলার চেয়ে ঢের বেশী, সেটা একরকম নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি । কে জানি, এ জন্যই হয়তো আমরা সবাই বারবার ছোটবেলায় ফিরে যেতে চাই, সুন্দর ঝামেলাহীন একটা নির্মল প্রশান্তি ওয়াও ভরা জীবনে।
এখনো মনে পড়ে, সেবার বিস্ময়ে হা হয়ে গেছিলাম, ছোটবেলা যেবার প্রথম রাজশাহী থেকে চাপাই অভিমুখী, ফ্যাকাসে জন্ডিস মার্কা, আধাপোড়া ইটের গুড়ার রঙয়ের লোকাল ট্রেন দেখেছিলাম। কথা বলতে পারিনি, শুধুই দেখেছি দুচোখ ভরে—বাপরে ট্রেন আবার এত্ত বড় হয় নাকি?। ধিকচিক…, ধিকচিক…, শব্দ যখন শেষ হলো, তখন বুঝলাম রেল গাড়ীটি আমাদের পাশ কাটিয়ে ততক্ষনে চলে গেছে বহুদূরে। ততক্ষনে বাস্তব জীবনে ফিরে এসে আমি মনে মনে বলতে থাকতাম, “বড় হবে জানি, তাই বলে এত্ত বড়— বাপরে! তাও আবার পুরোটায় লোহার তৈরি, এমনকি চাকাটাও লোহার”। স্কুলে অঙ্কের নামতা যতটুকু শিখেছিলাম, সে দিয়ে তো মুখে মুখে হিসেব কষে কুলাতে পারছিনা, দম বন্ধ হয়ে আসছে একেবারে, আনমানিক কত মন লোহা দিয়ে ট্রেনটি বানানো হতে পারে সেটা ভেবে ভেবে। এরপর ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলাম, আর সেই সাথে পদ্মা একপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, দেখা হলো আরও কত রঙ্গের আন্তঃ নগর রেলগাড়ীর সাথে, পরে খুব বেশী অবাক না হোলেও লোকাল ট্রেনের চেয়ে ভেতরের পরিবেশ এত সুন্দর হয়, সেটা ভেবে আমার মনের ভেতরে একটুতো অন্য রকম অনুভূত হচ্ছিলই।
বাংলা সিনেমার শিশু চরিত্রের শেষে, ঠিক নায়ক যেভাবে হঠাত করেই আবির্ভুত হয় ‘২০ বছর পর’ একটা হেড লাইন দিয়ে । অনেকটায় সেভাবে নেদারল্যান্ড থেকে সুইজারল্যান্ড যাবার পথে, ইউরোপের সবচেয়ে অত্যাধুনিক বুলেট ট্রেনে ভ্রমনের অভিজ্ঞতা হলো আমার। তখন আরেকবার ওয়াও বলে হা করে দেখলাম, আহারে কি মনোরম পরিবেশ যাত্রীদের জন্য! আবার ট্রেনের ভাড়া যে প্লেনের ভাড়া থেকেও বেশী হতে পারে সেটা সেবার-ই ঠিক বুঝেছিলাম । শুধু কি তাই, ট্রেনও ডাবল ডেকার (দোতালা) হয় সেটাও নেদারল্যান্ডেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল প্রথম। মাঝখানে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল তবে, প্রথম প্রথম হংকং এর পাতাল ট্রেন (MTR) ভ্রমন, কখনো সাগর কিংবা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সরু টানেল, কখনো আবার বহুতল ভবনের নীচে বিশাল MTR স্টেশনগুলো, কিছুটা বিস্ময় জাগিয়েছিল মনে। কিন্তু, আজ কেন জানি সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
আবার এটাও মনে পড়ছে যে, প্রাথমিকের একেবারে প্রথম ধাপে, লোকে জিজ্ঞেস করলে, আমি বলতাম ‘ছোট ওয়ানে’ পড়ি (ক্লাস ওয়ানের নীচের ধাপ আরকি। কারন, তখনকার দিনে প্রিপারেটরী স্কুল, কেজি, নার্সারী ইত্যাদি নামক শহুরে ইংরেজি শব্দগুলো আমাদের গ্রামে পৌছায়নি। প্রতিবেশী সম্পর্কে উম্বর আলী দাদু, তৎকালীন জামে মসজিদের মোয়াজ্জিন, যিনি আমাদের সদ্য এমপিওভুক্ত হাট দামনাশ এবতাদীয়া মাদ্রাসার (প্রাইমারী স্কুলের সমমানের) ছোট ওয়ানের শিক্ষক। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবে কয়েকটা নতুন ঘর উঠেছে, তাও আবার বুনের বেড়া আর টিনের ছাউনী দেয়া। আমাদের জন্য তখন মাদ্রাসা ঘেঁষা বড় ঈদগাহ ময়দানে, বড় আম গাছের ছাঁয়াতে চটের বিছানা পেতে পাঠাদান করা হতো । এইবার বড় ক্লাসে উঠতেই কয়েকটা ইটের দালান ঘর তরতর করে উঠে যেতে দেখলাম। তবে, মাদ্রাসায় পড়ি বলে আত্তীয়-স্বজন দেখা হলেই, হুজুর হুজুর বলে ডাকে, তাতে আমার একদমি ভালো লাগতোনা। তাছাড়া আমাদের বইয়ে রঙ্গিন মানুষ কিংবা জীব জন্তুর ছবি থাকতোনা। এই জন্য মনটা বড্ড বেশী খারাপ হতো। অথচ, দেখতাম সমবয়সী চাচাতো-মামাতো ভাই-বোনদের কি সুন্দর সুন্দর চকচকে মলাটের বাহারী রঙ্গের বই। যাহোউক, অপেক্ষায় ছিলাম, কবে পঞ্চম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষাটা শেষ হয়। কারন, ক্লাস সিক্সে উঠলেই আব্বা আমাকে হাইস্কুলে দেবেন। মাদ্রাসায় পড়ার উদ্দেশ্য ছিল কোরান শরীফ পড়তে শেখা; আর আমি সেটাতো ইতোমধ্যেই আয়ত্ত করে ফেলেছি। হাইস্কুলে এসেই রঙ্গিন বই হাতে পেতেই আহ! সে যে কি খুশী, বহুদিন বাদে আরও একবার ওয়াও অভিজ্ঞতার দেখা পেলাম। এইবার স্কুলের নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস করবার মনে বড় সাধ। কিন্তু দামনাশ পার দামনাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের তিনটা রুমের, একটা অফিস ঘর, একটা মেয়েদের কমন রুম, আর একটা সেতো এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ। এভাবে যখন অষ্টম শ্রেণী শেষে, হাইস্কুলের সব চেয়ে বড় ক্লাসে গেলাম আর নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস করতে শুরু করলাম। ওয়াও! সেদিন নিজের কাছে সে যে কি প্রশান্তি লাগছিলো, তা বলে বোঝানো যাবেনা।
এরপর স্কুল শেষে, রাজশাহী পলিটেকনিকে চান্স পেলে, ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে একেকটা ল্যাবে, এত্ত সব যন্ত্রপাতি দেখে বারবার ওয়াও আর ওয়াও হতে থাকলাম। ডিপ্লোমা শেষে, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে IUBAT-তে বি.এস.সি. ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করলাম, তখন দেখি এত সুন্দর ক্যাম্পাস! এমন অনুুভুতি হবেইবা না কেন, সারা জীবন কেটেছে যার ভাঙ্গা বেঞ্চে বসে ক্লাস করতে করতে। এইবারতো একটা ট্যাবলেট চেয়ারে একা বসতে পারবো। আবার মাথার উপরে ফ্যানও ঘুরবে, একবার ভাবতে পারছেন। আবার আমার ক্লাসমেটদের অনেকেই নেপাল থেকে আসা উজ্জ্বল ফর্সা, সুন্দর সুন্দর মেয়ে। বাহ! আরো একবার ওয়াও আর ওয়াও! তাই ভার্সিটি ছুটি হলেই, আমি যখন গ্রামে ফিরতাম, প্রতিবারই আমার সাথে ফিরতো কলেজ পড়ুয়া গ্রামের বন্ধুদের জন্য এক বাক্স বিদেশী বান্ধবীদের নিয়ে গল্প। এভাবে একসময় বিশ্ববিদ্যালয় শেষে দেশের বাহিরে, সেও আবার থাইল্যান্ডে, AIT-তে। এবারের ওয়াও সেতো আগের সব ওয়াও এর চেয়ে বড়সড় ওয়াও। কারন, স্বল্প বসনা মেয়েদের চোখের সামনে দেখার অভিজ্ঞতা শৈশবের লোকাল ট্রেন দেখে বিস্মিত হবার চেয়ে বড় বিস্ময় তো বটেই । সেই সাথে ক্যাম্পাসের এত বিশালতা, সম্পুর্ন এসি করা, পড়াশুনার সুযোগ সুবিধা, পাঁচমিশালী বিদেশী বন্ধু-বান্ধবী সাথে সুবিশাল লাইব্রেরী । সব কিছুই অসম্বব রকম ভালো লাগতো। তারপর একে একে জার্মানী, নেদারল্যান্ড সহ ইউরোপের অনেক সুন্দর সুন্দর দেশ যেমন- ফ্রান্স, স্পেইন, সুইজারল্যান্ড ঘুরে বহুবার বিশাল ওয়াও অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম । স্পেইনের আলিকান্তে নামক শহরের সমুদ্র সৈকতে গিয়ে দেখি আরেক লঙ্কাকান্ড—সমুদ্র সৈকতে সম্পুর্ন নগ্ন যুবতী মেয়েরা ‘সান বাথ’ করছে, কোন রকম দ্বিধা-দন্দহীনভাবে । সেদিনই প্রথমবার বিস্মিত হবার পাশাপাশি, বড় বেশী অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, মানুষের চক্ষু লজ্জা বলে যে একটা কথা আমরা কথায় কথায় বলি, সেটা আমার মধ্যেও আছে। এভাবে, একের পর এক, শুধু বিস্ময় নিয়ে চলতে থাকলো পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা অভিজ্ঞতা লাভ। যেমন ধরুন, বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, ছেলেমেয়েদের হোস্টেল যে আলাদা হয়না, এমনকি একই হোস্টেলে ছেলেমেয়ে পাশাপাশি রুমে থাকতে পারে, এরকম নানা জানা অজানা অভিজ্ঞতা।
তবে সবশেষে, যে কথাটি বলবো বলে পাঠকদের এতো লম্বা গল্পের ফাঁদে আটকে ফেললাম, সেটা পরিষ্কার করে বলছি এখন। আমি যে জিনিসটা বলার চেষ্টা করছি এতক্ষন সেটা হলো, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে উপরের অবস্থান থেকে নীচের দিকে তাকালে নিজেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে খ্যাঁত মনে হবে । আর নীচে থেকে উপরের দিকে দেখতে থাকলে শুধু বিস্ময়ে ভরা ওয়াও আর ওয়াও। অথচ, আজকের ওয়াও অভিজ্ঞতাকেই আগামীদিনের খ্যাঁত বলে মনে হতে পারে। তাই বলে খ্যাঁতকে বাদ দিলেতো ওয়াও অভিজ্ঞতা লাভ করা যাবেনা, মাঝে ছন্দ পতন হবে, তাইনা? একবার ভাবুন, আমার কাছে সেদিনের রাজশাহী-টু-চাপাই অভিমুখী, সে লোকাল ট্রেন দেখে এসে কেউ যদি বিস্ময়ে নিয়ে গল্প জুড়ে বসে তবে, আমার কাছে তাকে খ্যাঁত মনে হতেই পারে। অথচ, এই আমিই একসময় ঠিক একিভাবে একই বস্তু দেখে তার মতই বিস্মিত হয়েছি । আবার সেদিনের খোলা আকাশের নিচে আমগাছের ছাঁয়ায় চট পেতে বসে স্কুল করেছি বলেই কিংবা, ভাঙ্গা বেঞ্চে বসে ক্লাস করেছি বলেই, পরবর্তীতে জীবনে ভাল সুযোগ পেতেই সেটাকে লুফে নিয়ে ভালো কিছু করার জন্য সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। আর তাই বলেই হয়তো আলহামদুলিল্লাহ! হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও ধাপে ধাপে নিজেকে এগিয়ে নিতে পেরেছিলাম সামনের দিকে।
আমাদের জীবনের অনেক অভিজ্ঞতায় এরকম; আপনার কাছে যেটি বিস্ময় অন্য কারো কাছে হয়তো সেটা অতি সাধারন একটা বিষয় মাত্র। এটাই মানব জীবনের চরম সৌন্দর্য্যময় একটি দিক। তাই জীবনে আপনি যে পজিশনে আছেন, সেখান থেকে বারবার বিস্ময়ে সামনের ওয়াও অনুভূতি লাভের চেষ্টা করে যান। কারন, অবাক বিস্ময় মানেই ওয়াও বলে বিস্মিত হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেরণা লাভ করা। উদহারন স্বরূপ, আপনি যখন কম্পিউটারে কিংবা মোবাইলে ভিডিও গেইমস খেলেন, কখনো কি লক্ষ করে দেখেছেন, আপনি ঠিক কোন সময় এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছেন কিংবা, কখন সেটা নেশাতে পরিনত হচ্ছে। আপনি যখনি একের পর এক কঠিন ধাপ পার করে সামনের দিকে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন, ঠিক তখনি পরের লেভেলে যাবার প্রচণ্ড প্রত্যয় তৈরি হচ্ছে। আমদের জীবনের লেভেলটাও ঠিক অনেকটা সেরকম; এখানে এক্সাইমেন্ট না থাকলে আপনি সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরনা হারিয়ে অবসাদের কবলে পড়তে পারেন। তাই, আপনি আপনার আগামি দিনগুলিতে বিস্ময় নিয়ে বারবার ওয়াও অনুভুতির দারা সবসময় নতুন কিছু দেখার, জানার এবং শেখার প্রচণ্ড আগ্রহবোধ ধরে রাখার চেষ্টা করুন। কেননা, আমাদের সকলেরই জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে ওয়াও অনুভূতিটা ভীষন জরুরী। যেটা এমন একটা অদৃশ্য শক্তি, যা আপনাকে সামনের দিকে স্রোতের বেগে টেনে নিয়ে যাবে। যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার অবস্থানে থেকে স্রষ্ঠার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। আর বেশী বেশী চেষ্টা করুন, যাতে বিস্ময়ে ভরা ওয়াও অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। এভাবে ওয়াও এর অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পুরো উদ্যমে উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকুন, আর জীবনটাকে উপভোগ করুন।
 
২৪হেল্পলাইন.কম/এপ্রিল, ২০১৮/
লেখকঃ হাসনাত বাদশা, হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত বাংলাদেশী ছাত্র
 
By | 2018-10-18T07:00:47+00:00 April 15th, 2018|Comments Off on দি পাওয়ার অব ‘ওয়াও’! (The Power of ‘Wow’!)