ডিজিটাল শৈশবের কুৎসিত রূপ

Home/ডিজিটাল শৈশবের কুৎসিত রূপ
See this post 3 views

ডিজিটাল শৈশবের কুৎসিত রূপ

শিশুদের নিয়ে এক গবেষনায় দেখা গেছে যে, যেসব শিশুরা শরীর চর্চা কিংবা খেলাধুলায় নিয়োমিত অংশগ্রহন করে থাকে, তাদের বুদ্ধির বিকাশ, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, মনোযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি, খেলাধুলা না করা বাচ্চাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশী। খেলাধুলা তাই একইসাথে শিশুদের শরীর এবং মন উভয়ই গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অথচ, খেলাধুলার মত নির্মল পবিত্র বিনোদন ছেড়ে দুর্ভাগা বাঙ্গালী জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ ডিজিটাল যুগের বিষাক্ত ছোবলে ভয়াবহ পরিনতির দোর গোড়ায় উপনীত।
মনে পড়ে একসময় স্কুল শেষে বিকেলে খেলাধুলা না করলে পেটের ভাত হজম হতোনা। বিশেষ করে বার্ষিক পরীক্ষার আগের সপ্তাহে, বাসায় অবিভাবকদের কড়াকড়িতে খেলতে যাওয়া হতোনা বলে মনের মধ্যে সেকি চাপা খোব আর কান্না ভর করতো, বলে বোঝানো যাবেনা। যদিও তখনকার দিনে খেলাধুলা করার তেমন কোন আহামরি সামগ্রী আমাদের হাতে ছিলনা। বলতে গেলে এলাকার কাঠ মিস্ত্রির কাছ থেকে বানানো সস্তা আম কাঠের ক্রিকেট ব্যাট, আর সবাই মিলে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে হারিচাঁদা তুলে কোনরকম একটা টেনিস বল। এভাবে রোজ খেলাধুলা করে সন্ধ্যায় দলবেঁধে বাড়ি ফেরা হতো ঠিক মাগরিবের আজানের পরপর। এরপর পুকুরঘাটে হাতমুখ ধুয়ে মায়ের আচলে মুখখানা মুছে নিলেই মনটা এতটায় ফ্রেশ হয়ে যেত যে, পড়তে বসলে খুব তাড়াতাড়ি পড়া মুখস্ত হয়ে যেত। তারপর রাতের খাবার শেষে আলিফ লাইলা, সিন্দাবাদ কিংবা আলি বাবা আর চল্লিশ চোর ইত্যাদি হরেক রকম আরব্য উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত সব জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল দেখার ধুম পড়তো। তাও আবার দেখতে যেতে হতো পাশের কোন গ্রামে। কারন, টেলিভিশন তো আর এখনকার মতন ঘরে ঘরে ছিলনা । এরপর রাত ১০-টা বাজলেই চোখে রাজ্যের ঘুম ভর করতো। খেলাধুলা করে ক্লান্ত শরীরে ঘুম যে একটা আসতো, আহ! সেতো একেবারে পরিষ্কার একটা ঘুম। এরপর, সকালে উঠেই গরম ভাত সাথে মায়ের হাতে মাখানো শুকনা মরিচ পোড়া আঠালো সে আলু ভর্তা কিংবা দেশী মুরগীর ডিম ভাজি দিয়ে পেট পুরে খেয়ে দেয়ে স্কুলে যাওয়া। ক্লাসের পরে টিফিনে গিয়ে আবারো ৩০ মিনিট স্কুলের আঙ্গিনায় খেলাধুলা আর বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকা। আমাদের একেকটা দিনগুলোকে বৃষ্টিস্নাত নির্মল, নিষ্পাপ কিংবা শুভ্র প্রকৃতির মতো মনে হতো। অথচ, আজ গ্রামে গেলে ডিজিটাল যুগের শিশু কিশোরদের বেড়ে উঠার ধরন দেখলে ভয়ে আতকে উঠতে হয়।
সেই যে গ্রাম ছেড়েছি দু-দশক আগে, এরপরেতো শুধুই ঈদে চাঁদে ছাড়া বাড়ি যাওয়া আর হয়ে ওঠেনা। তবে, প্রতিবার গ্রামে গেলে নতুন কিছু চোখে পড়ে, এই ধরুন শতবর্শী গ্রামের কোন এক বিশাল বৃক্ষ কাটা পড়েছে, যার কারনে চিরচেনা সে যায়গাটুকুও চোখের সামনে কেমন যেন খাপ ছাড়া, একটা অচেনা গ্রামের অচেনা যায়গা মনে হয়। একিভাবে প্রতিবেশীর মুখে শুনতে পাওয়া যায় কোন এক মুরুব্বীর মারা যাবার সংবাদ। তাতে মুহুর্তে সেই কাল্পনিক টাইম মেশিন আপনাকে আমাকে শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলিতে নিয়ে চলে যায় এক নিমিষেই, যেখানে আপনি স্পষ্টভাবে দেখতে পান সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রামের বুড়ো মোয়াজ্জিন দাদুকে। হয়তো, শৈশবে তার কাছেই আরবি শিখতে রোজ সকালে হাজিরা দিতেন অথবা গ্রামের সেই বুড়ী দাদিমাকে, যিনি আপনাকে তার পুরানো কাসার পানদানি থেকে মিষ্টি জর্দা আরা গুড়া করে রাখা সুপারি দানা সাথে চুন সমেত একটা পান বানিয়ে দিতেন। আবার এমনও শুনা যায় যেমন, খুবি অল্প বয়সে আপনার সমবয়সী কেউ একজন দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা গেছেন, যা শুনে মুহুর্তে মৃত্যু ভয়ে আপনার শরীরে লোম খাড়া হয়ে যায়। এসব দুঃসংবাদ পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে যাবার সাথে সাথে ইদানীং কিছু বিষয় আমাকে বেশ ভাবায় যা আজকে আপনাদেরকে শুনাতে চায়।
আজকাল গ্রামে একটা জিনিস আমার সচেতন মনের ভেতরে প্রতিনিয়তই কড়া নাড়ে—সেটা হলো, ভিডিও গান ডাউনলোডের দোকানের অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি। মানছি, মানুষের বিনোদনের প্রয়োজনে যুগের চাহিদা অনুযায়ী সামাজের কিছু যায়গায় পরিবর্তন আসাটায় স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। তাই বলে নৈতিকতার এমন অধপতনকেতো আর সাঁয় দেয়া যায়না। কি আর বলবো, আমার গ্রামের ছোট্র একটা বাজারে গতবার লক্ষ্য করলাম অন্তত ৭-৮ টা এরকম কম্পিউটার নিয়ে ভিডিও গানের ডাউনলোড ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে গান, নাটক, সিনেমা, ইসলামিক সঙ্গীত, কোর’আন শরীফের তফসিরের সাথে সাথে পর্নগ্রাফী এলাকার সব বয়সী মানুষের হাতে সহজলভ্য হয়ে গেছে। একেবারে প্রাইমারী স্কুলের শিশুদের হাতে পর্যন্ত পর্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক সময় ছোট-বড় একসাথে মিলে তৃতীয় শ্রেণীর সিনেমা তারকাদের দিয়ে নির্মিত অর্ধনগ্ন গান উপভোগ করছেন অবলীলায়। তাই, আজ আর বৈকালে সেদিনের মত খেলার মাঠে কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়না । সবাই এখন আড্ডাতে হাজির থাকে ব্যাঙ্গের ছাতার মত বেড়ে উঠা ঐসব দোকানগুলোতে। তাছাড়া সুযোগ পেলেই উঠতি বয়সী কিশোর ছেলেরা মিলে তামাক সেবনের কাজাটাও সেরে ফেলে সেসব দোকানের অন্তরালে। সেইসাথে কেন জানি এলাকার স্কুল কলেজের মাঠগুলোও দখল হয়ে গেছে নানাভাবে। চারিদিকে দখলবাজিতে ক্রমশই খেলার মাঠটি ছোট হয়ে গেছে। কলেজ মাঠটিও আজ বাউন্ডারী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। তবে খেলা ধুলার চর্চা থাকলে সেটা হয়তো স্কুল/কলেজের প্রশাসন অমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত সাহস পেতোনা। যেহেতু মাঠগুলো আজ কোন কাজে আসেনা, কোন খেলাধুলা হয়না, তাই কর্তৃপক্ষ হয়তো ভাবে কি আর হবে অমন মাঠ ফেলে রেখে। একবার ভাবেন, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ কোন অসুস্থ সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে উঠছে আমাদের চোখের সামনে। একেতো শিক্ষা ব্যবাস্থায় প্রশ্ন ফাঁস, এ+ এর ছড়াছড়ি লেগেই আছে। এর মাঝে এত কম বয়সে পর্নগ্রাফীর মত ভায়াবহ থাবা কিশোরদের কচি মন দুষিত করছে প্রতিনিয়তই। শুনতে খারাপ লাগলেও সমাজে ডিজিটাল শৈশবের সে কুৎসিত রুপ আজ সবার কাছে উন্মোচিত, তবুও কি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ভয়াবহ পরিনতির দিকে ধাবিত হতে দেখতেই থাকবো। আমার মনে হয় সরকারীভাবে কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থার সাথে সাথে প্রতিটি এলাকার বড়দের এবং অবিভাবকমন্ডদলীদের বিশেষভাবে সচেতন হওয়া জরুরী। তা যদি না হয়, তবে কার কাছে আমরা ভবিষ্যতে একটা নিরাপদ সমাজ আশা করবো? যেখানে সমাজে অন্তত দোলনায় দোলখাওয়া সেই নিষ্পাপ শিশুটি রক্ষা পাবে যৌনতার ভায়াবহ থাবা থেকে।
২৪হেল্পলাইন.কম/এপ্রিল, ২০১৮/অাবু হাসনাত বাদশা, হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত বাংলাদেশী ছাত্র
By | 2018-10-18T06:37:23+00:00 April 12th, 2018|Comments Off on ডিজিটাল শৈশবের কুৎসিত রূপ